وَلَقَدۡ كَتَبۡنَا فِي ٱلزَّبُورِ مِنۢ بَعۡدِ ٱلذِّكۡرِ أَنَّ ٱلۡأَرۡضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ ٱلصَّٰلِحُونَ١٠٥
১০৫. আর অবশ্যই আমরা ‘যিকর’ এর পর যাবূরে লিখে দিয়েছি যে, যমীনের অধিকারী হবে আমার যোগ্য বান্দাগণই।
আসল ইমাম মাহদী: সহীহ হাদীসের বিবরণ ও ভণ্ড চেনার উপায়
তিনি নিজে থেকে কোনো ক্যাম্পেইন করবেন না বা মানুষের কাছে বাইয়াতও চাইবেন না। জেনে নিন তাঁর চেহারা, এক রাতে প্রস্তুত হওয়া, বায়দা মরুভূমিতে সেনাবাহিনী ধসে যাওয়া এবং ঈসা (আ.)-এর সাথে তাঁর নামাজের আসল ঘটনা।
- প্রকাশিত
- ১৭ মিনিট লাগবে
ইতিহাসে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে দাবি করেছে, ‘আমিই ইমাম মাহদী!’ অথচ নবীজি ﷺ আমাদের এমন এক সহজ ফিল্টার দিয়ে গেছেন যা দিয়ে এক সেকেন্ডে সব ভণ্ডকে আলাদা করা যায়: আসল মাহদী কখনোই নিজেকে মাহদী দাবি করে প্রচারণা চালাবেন না। বরং নেতৃত্বের ভয়ে মদিনা থেকে মক্কায় পালিয়ে যাবেন, আর রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝখানে তাঁকে বাধ্য হয়ে বাইয়াত গ্রহণ করতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই একটা প্রশ্ন তোলেন: ‘সহীহ বুখারী ও মুসলিমে তো ইমাম মাহদী শব্দটাই নেই, তাহলে এটা কীভাবে প্রমাণিত হলো?’
উত্তরটা খুব সহজ ও মজার: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইমাম মাহদীর ঘটনা ঠিকই আছে, সেখানে শুধু ‘মাহদী’ উপাধিটা উল্লেখ না করে তাঁর কাজ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে! আর সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও মুসনাদে আহমদের সহীহ হাদীসগুলোতে সরাসরি তাঁর নাম ও উপাধি উল্লেখ করে পুরো ছবিটা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে।
সহীহ বুখারী (৩৪৪৯) এবং সহীহ মুসলিমে (১৫৬) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি ﷺ বলেছেন:
> ‘কেমন হবে তোমাদের অবস্থা, যখন মারইয়াম পুত্র ঈসা তোমাদের মাঝে অবতরণ করবেন, আর তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই একজন!’
আবার সহীহ মুসলিমেই (২৮৮২) কাবা ঘরে আশ্রয় নেওয়া সেই ব্যক্তির কথা এসেছে, যাঁর বিরুদ্ধে পাঠানো পুরো সেনাবাহিনীকে মদিনা ও মক্কার মাঝখানের ‘বায়দা’ মরুভূমিতে ধসিয়ে দেওয়া হবে।
প্রায় ২০ জনেরও বেশি সাহাবী ইমাম মাহদী সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম শাওকানী, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম, কাত্তানী এবং শায়খ আলবানী (রহ.)-সহ শীর্ষ মুহাদ্দিসগণ একমত যে ইমাম মাহদী সংক্রান্ত হাদীসগুলো ‘মুতাওয়াতির মা’নাবী’ (অর্থগতভাবে অকাট্য ও অসংখ্য সূত্রে প্রমাণিত)। তিনি মূলত কিয়ামতের ছোট আলামত এবং বড় আলামতগুলোর মাঝখানের সেতুবন্ধন।
ইমাম মাহদীর পরিচয় নিয়ে যেন কারও মনে কোনো ধোঁয়াশা না থাকে, সেজন্য নবীজি ﷺ তাঁর নাম, বংশ এবং চেহারার স্পষ্ট বর্ণনা দিয়ে গেছেন:
- নাম ও পিতার নাম: তাঁর নাম হবে নবীজির ﷺ নামের অনুরূপ (মুহাম্মদ অথবা আহমদ), এবং তাঁর বাবার নামও হবে নবীজির ﷺ বাবার নামের অনুরূপ (আব্দুল্লাহ)। অর্থাৎ তাঁর পূর্ণ নাম হবে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সুনানে আবু দাউদ ৪২৮২)।
- বংশধারা: তিনি নবীজির ﷺ পরিবার (আহলে বাইত) থেকে আসবেন। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ফাতিমা (রা.)-এর বড় ছেলে হাসান ইবনে আলী (রা.)-এর বংশধারা থেকে তাঁর জন্ম হবে (সুনানে আবু দাউদ ৪২৮৪)।
- হাসান (রা.)-এর বংশেই কেন? ইবনুল কাইয়্যিম ও ইবনে কাসীর (রহ.) এর পেছনে দারুণ একটি হিকমত উল্লেখ করেছেন। ৪১ হিজরীতে হাসান ইবনে আলী (রা.) মুসলিম উম্মাহর রক্তপাত বন্ধ করতে ও ঐক্য ফিরিয়ে আনতে স্বেচ্ছায় খিলাফতের দাবি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষমতা ছেড়েছিলেন বলে আল্লাহ তাঁরই বংশধরদের মাধ্যমে উম্মাহর সর্বশেষ ন্যায়পরায়ণ খলিফা পাঠিয়ে সম্মানিত করবেন!
- চেহারা ও শারীরিক গঠন: তাঁর কপাল হবে চওড়া ও উজ্জ্বল (আজলাল জাবহাহ) এবং নাক হবে উঁচু ও বাঁশির মতো সুন্দর বাঁকানো (আকনাল আনফ) (সুনানে আবু দাউদ ৪২৮৫)। তাঁর চরিত্র হবে নবীজির ﷺ চরিত্রের মতো, তবে শারীরিক গড়ন হুবহু নবীজির ﷺ মতো হবে না।
- শাসনকাল: তিনি ৭, ৮ বা ৯ বছর শাসন করবেন। পৃথিবী যেভাবে জুলুম ও অবিচারে ভরে গিয়েছিল, তিনি ঠিক সেভাবেই পৃথিবীকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারে ভরিয়ে দেবেন। সে সময় সম্পদের এত প্রাচুর্য হবে যে মানুষ অঞ্জলি ভরে সম্পদ নেবে, গুনেও দেখা হবে না (সহীহ মুসলিম ২৯১৩, সুনানে আবু দাউদ ৪২৮৫)।
সুনানে ইবনে মাজাহ (৪০৮৫) এবং মুসনাদে আহমদে (৬৪৫) আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে নবীজি ﷺ বলেছেন:
> ‘মাহদী আমাদের আহলে বাইতেরই একজন; আল্লাহ এক রাতেই তাঁকে সংশোধন ও প্রস্তুত করে দেবেন (ইউসলিহুল্লাহু ফী লাইলাহ)।’
এখন প্রশ্ন হলো, ‘এক রাতে প্রস্তুত করে দেবেন’ কথার মানে কী? এর মানে কি এই যে তাঁর ওপর নবীদের মতো ওহী নাযিল হবে? একদমই না! মুহাম্মদ ﷺ-এর মাধ্যমে নবুওয়াতের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। ইবনে কাসীর (রহ.) এবং মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) এর ৩টি খুব সুন্দর ও বাস্তবসম্মত অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন:
- রাতারাতি নেতৃত্বের যোগ্যতা দান: সেই রাতের আগ পর্যন্ত তিনি একজন সাধারণ বিনয়ী নেককার মানুষ হিসেবেই থাকবেন। তিনি নিজেকে ইমাম মাহদী বলে দাবিও করবেন না, ক্ষমতার পেছনেও ছুটবেন না। কিন্তু এক রাতের মধ্যে আল্লাহ তাঁর হৃদয়ে পুরো উম্মাহকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো হিকমত, সাহস ও মানসিক শক্তি ঢেলে দেবেন।
- তাওবা কবুল ও বিশেষ তাওফীক: আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করবেন, তাঁর অন্তরকে পরিশুদ্ধ করবেন এবং আসন্ন মহাপরীক্ষা মোকাবিলার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফীক দেবেন।
- মানুষের অন্তর একত্রিত হওয়া: কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা ছাড়াই রাতারাতি আলেম ও সাধারণ মুমিনদের অন্তর তাঁর নেতৃত্বের ওপর একমত হয়ে যাবে।
পৃথিবীর মানুষ কীভাবে শতভাগ নিশ্চিত হবে যে এই ব্যক্তিই আসল ইমাম মাহদী? কোনো ফেসবুক পোস্ট, স্বপ্ন বা ইউটিউব ভিডিও দেখে? মোটেও না! নবীজি ﷺ সুনানে আবু দাউদ (৪২৮৬) এবং সহীহ মুসলিমে (২৮৮২-২৮৮৪) পরপর ৩টি দৃশ্যের এক নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ বলে দিয়েছেন:
দৃশ্য ১: এক শাসকের মৃত্যু ও চরম বিশৃঙ্খলা
একজন খলিফা বা শাসকের মৃত্যুর পর ক্ষমতা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ও বিশৃঙ্খলা শুরু হবে। এই ফিতনা ও রক্তপাত থেকে দূরে থাকতে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যাবেন। ক্ষমতা বা নেতৃত্বের কোনো ইচ্ছাই তাঁর থাকবে না।
দৃশ্য ২: রুকন ও মাকামের মাঝখানে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাইয়াত
মক্কার আলেম ও নেককার মানুষেরা তাঁকে চিনে ফেলবেন। তিনি নেতৃত্ব নিতে অনিচ্ছুক (ওয়া হুয়া কারিহ) থাকা সত্ত্বেও মানুষ তাঁকে বের করে আনবে এবং কাবা ঘরের রুকন (হাজরে আসওয়াদ কোণ) ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝখানে তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করবে।
দৃশ্য ৩: আসল প্রমাণ, বায়দা মরুভূমিতে সেনাবাহিনী ধসে যাওয়া (খাসফ)
মক্কায় তাঁর বাইয়াতের খবর ছড়িয়ে পড়লে শাম অঞ্চল থেকে তাঁকে দমন করার জন্য এক বিশাল সেনাবাহিনী পাঠানো হবে। বাহিনীটি যখন মদিনা ও মক্কার মাঝখানের ‘আল-বায়দা’ নামক মরু প্রান্তরে পৌঁছাবে, তখন আল্লাহর হুকুমে মাটি ফেটে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো সেনাবাহিনীকে মাটির নিচে ধসিয়ে দেওয়া হবে!
উম্মে সালামা (রা.) নবীজিকে ﷺ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করেছিলেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই দলে যদি এমন কেউ থাকে যাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে বা যে কেবল পথচারী ছিল, তার কী হবে?’ নবীজি ﷺ উত্তর দিলেন: ‘দুনিয়াতে সবাই একসাথেই মাটির নিচে ধসে যাবে, তবে কিয়ামতের দিন প্রত্যেকে নিজের নিয়ত অনুযায়ী পুনরুত্থিত হবে’ (সহীহ মুসলিম ২৮৮২)।
ইমাম মাহদীর শাসনামলেই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি সামনে আসবে: দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। ইসফাহানের ৭০ হাজার অনুসারীসহ দাজ্জাল পৃথিবীতে তাণ্ডব চালাবে, আর ইমাম মাহদী ও মুমিনদের মূল বাহিনী শামে (দামেস্ক ও বাইতুল মুকাদ্দাস অঞ্চলে) অবস্থান নেবেন।
ঠিক তখনই আসবে ইতিহাসের সেই অবিস্মরণীয় ভোর, যার জীবন্ত বর্ণনা রয়েছে সহীহ মুসলিমে (২৯৩৭ ও ১৫৬):
- ফজরের নামাজের ইকামত দেওয়া হয়ে গেছে, ইমাম মাহদী নামাজের ইমামতি করার জন্য সামনে এগিয়েছেন।
- ঠিক সেই মুহূর্তে দামেস্কের পূর্ব দিকের সাদা মিনারের কাছে আকাশ থেকে অবতরণ করবেন আল্লাহর নবী ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)! তাঁর পরনে থাকবে জাফরানি রঙের হালকা ছোঁয়া লাগানো দুটি কাপড়, আর তাঁর দুই হাত রাখা থাকবে দুজন ফেরেশতার ডানার ওপর। তিনি মাথা নিচু করলে মুক্তার মতো পানির ফোঁটা ঝরবে, মাথা তুললে রুপার দানার মতো চকচক করবে।
- আল্লাহর নবী ঈসা (আ.)-কে দেখে ইমাম মাহদী সম্মানের সাথে পেছনে সরে আসতে চাইবেন যেন ঈসা (আ.) নামাজের ইমামতি করেন।
- ঈসা (আ.) তখন ইমাম মাহদীর দুই কাঁধের মাঝখানে হাত রেখে বলবেন:
> ‘আপনিই সামনে এগিয়ে নামাজ পড়ান, কারণ এই নামাজের ইকামত আপনার জন্যই দেওয়া হয়েছে!’
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর একজন মহান রাসূল উম্মতে মুহাম্মদীর ইমামের পেছনে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। আলেমগণ বলেন, এর মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়া হবে যে ঈসা (আ.) নতুন কোনো শরীয়ত নিয়ে আসেননি, বরং মুহাম্মদ ﷺ-এর শরীয়তের অনুসারী ও ন্যায়বিচারক হিসেবেই অবতরণ করেছেন। নামাজ শেষ হতেই ঈসা (আ.) দরজা খুলতে বলবেন এবং বাবে লুদে গিয়ে দাজ্জালকে হত্যা করবেন।
ইমাম মাহদীর আগমনের প্রতি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসাকে পুঁজি করে গত এক হাজার বছরে বহু উচ্চাভিলাষী নেতা ও ভণ্ড নিজেদের ‘মাহদী’ দাবি করেছে। কিন্তু নবীজির ﷺ দেওয়া ফিল্টারে তাদের প্রত্যেকেই হাতেনাতে ধরা পড়েছে:
- ইবনে তুমার্ত (মৃত্যু ১১৩০ খ্রি., মরক্কো): আল-মুওয়াহহিদিন আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নিজেকে ‘মাসুম মাহদী’ দাবি করেছিল। অথচ সে কুরাইশ বংশেরই ছিল না (ছিল বারবার গোত্রের), আর মরক্কোতেই তার মৃত্যু হয়।
- সৈয়দ মুহাম্মদ জৌনপুরী (মৃত্যু ১৫০৫ খ্রি., ভারত): ভারতে নিজেকে মাহদী দাবি করেছিল এবং আফগানিস্তানের ফারাহ অঞ্চলে মারা যায়। মক্কার বাইয়াত বা বায়দার ভূমিধসের কোনো চিহ্নই তার জীবনে ঘটেনি।
- সুদানের মুহাম্মদ আহমদ (মৃত্যু ১৮৮৫ খ্রি.): ১৮৮১ সালে নিজেকে মাহদী ঘোষণা করে ব্রিটিশ-মিশরীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং মাত্র চার বছর পর টাইফাস জ্বরে মারা যায়।
- মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (মৃত্যু ১৯০৮ খ্রি., ব্রিটিশ ভারত): সে সবচেয়ে আজব দাবিটি করেছিল, সে একাই নাকি ইমাম মাহদী, আবার সেই নাকি ঈসা (আ.), আবার নবীও! অথচ সহীহ হাদীসে ইমাম মাহদী (কুরাইশ বংশীয় মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ) এবং ঈসা ইবনে মারইয়াম (বনী ইসরাঈলের নবী), দুজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ, যাঁরা দামেস্কের মসজিদে একই সাথে দাঁড়াবেন!
- জুহাইমান আল-উতাইবী ও মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-কাহতানী (১৯৭৯ খ্রি., মক্কা): ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে একদল সশস্ত্র বিদ্রোহী মক্কার মসজিদুল হারাম দখল করে নেয়। তাদের নেতা জুহাইমান তার শ্যালক ‘মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-কাহতানী’-কে ইমাম মাহদী ঘোষণা করে বন্দুকের মুখে মানুষকে বাইয়াত নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে, শুধু এই যুক্তিতে যে তার নাম মিলে গেছে! ফলাফল কী হলো? কয়েক দিনের মাথায় অভিযানে খোদ সেই নকল মাহদী (কাহতানী) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়! না বায়দা মরুভূমিতে কোনো সেনাবাহিনী ধসে গেল, আর না পৃথিবীতে ইনসাফ কায়েম হলো।
অনেক তরুণ পাঠক আহলে সুন্নাহর ইমাম মাহদীর ধারণার সাথে ইসনা আশারিয়া শিয়াদের ‘গায়েব থাকা ১২তম ইমাম’-এর ধারণাকে গুলিয়ে ফেলেন। ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর আন-নিহায়াহ ফীল ফিতান ওয়াল মালাহিম গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে এই দুই ধারণার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য:
- ১. বাবার নাম: সহীহ হাদীসের মাহদী হলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ; আর শিয়াদের কল্পিত মাহদীর নাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল-আসকারী।
- ২. বংশধারা: সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী তিনি হাসান ইবনে আলী (রা.)-এর বংশধর; আর শিয়াদের দাবি তিনি হুসাইন (রা.)-এর বংশধর।
- ৩. স্বাভাবিক জন্ম বনাম ১১৫০ বছর গুহায় লুকিয়ে থাকা: আহলে সুন্নাহর বিশ্বাস অনুযায়ী ইমাম মাহদী শেষ জামানায় আর দশজন মানুষের মতোই জন্মগ্রহণ করবেন। অন্যদিকে শিয়াদের দাবি, ২৬০ হিজরীতে (৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে) ৫ বছর বয়সী এক শিশু ইরাকের সামাররার এক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে (সিরদাব) ঢুকে ১১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লুকিয়ে আছে!
- ৪. মিশন ও আদর্শ: আসল ইমাম মাহদী নবীজির ﷺ সুন্নাহ ও সাহাবীদের আদর্শে শাসন করবেন। অথচ উগ্র শিয়া গ্রন্থগুলোতে দাবি করা হয় তাদের মাহদী এসে সাহাবীদের বিচার করবে (নাউযুবিল্লাহ)।
- ৫. ন্যায়পরায়ণ খলিফা বনাম নবী-রাসূলের ওপরে স্থান: আহলে সুন্নাহর আকীদা অনুযায়ী নবী-রাসূলগণ ছাড়া কেউ নিষ্পাপ (মাসুম) নন। ইমাম মাহদী একজন মহান খলিফা, কিন্তু তাঁর মর্যাদা নবীগণ বা আবু বকর ও উমর (রা.)-এর ওপরে নয়।
তাহলে এই পুরো আলোচনা থেকে আমাদের আজকের শিক্ষা কী? আলেমগণ তরুণ প্রজন্মের জন্য ৩টি খুব স্পষ্ট ও প্র্যাকটিক্যাল রুল দিয়েছেন:
- হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না: ‘ইমাম মাহদী এসে সব ঠিক করবেন’, এই অজুহাতে নিজের ঈমান, ক্যারিয়ার, পরিবার ও সমাজ গঠনের দায়িত্ব ছেড়ে বসে থাকা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নবীজি ﷺ বলেছেন, কিয়ামত শুরু হয়ে গেলেও তোমার হাতে যদি একটি চারাগাছ থাকে এবং তা রোপণ করার সুযোগ পাও, তবে তা রোপণ করো (মুসনাদে আহমদ ১২৯০২)।
- স্বপ্ন বা গুজবে কান দিয়ে কাউকে মাহদী মানবেন না: যতক্ষণ না কাবা ঘরের রুকন ও মাকামের মাঝখানে অনিচ্ছুক ব্যক্তির বাইয়াত এবং বায়দা মরুভূমিতে পুরো সেনাবাহিনী মাটির নিচে ধসে যাওয়ার মতো প্রকাশ্য অলৌকিক আলামত নিজের চোখে প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ পৃথিবীর যে কেউ নিজেকে মাহদী দাবি করুক, তাকে বর্জন করুন।
- আজ থেকেই নিজেকে গড়ুন: আল্লাহ যেমন ইমাম মাহদীকে এক রাতে প্রস্তুত করবেন, তেমনি আমাদের কাজ হলো প্রতিদিন নিজের নামাজ, চরিত্র, হালাল রুজি ও দ্বীনি জ্ঞানকে সুন্দর করার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
۞কুরআনুল কারীমের প্রাসঙ্গিক আয়াত
وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ كَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِينَهُمُ ٱلَّذِي ٱرۡتَضَىٰ لَهُمۡ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّنۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ أَمۡنࣰ اۚ يَعۡبُدُونَنِي لَا يُشۡرِكُونَ بِي شَيۡـࣰٔ اۚ وَمَن كَفَرَ بَعۡدَ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ٥٥
৫৫. তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ্ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে যমীনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ‘ইবাদাত করবে, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না, আর এরপর যারা কুফরী করবে তারাই ফাসিক।
📜প্রামাণ্য হাদীস শরীফ
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، أَنَّ عُمَرَ بْنَ عُبَيْدٍ، حَدَّثَهُمْ ح، وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْعَلاَءِ، حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ، - يَعْنِي ابْنَ عَيَّاشٍ ح وَحَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ سُفْيَانَ، ح وَحَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى، أَخْبَرَنَا زَائِدَةُ، ح وَحَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى، عَنْ فِطْرٍ، - الْمَعْنَى وَاحِدٌ - كُلُّهُمْ عَنْ عَاصِمٍ، عَنْ زِرٍّ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لَوْ لَمْ يَبْقَ مِنَ الدُّنْيَا إِلاَّ يَوْمٌ " . قَالَ زَائِدَةُ فِي حَدِيثِهِ " لَطَوَّلَ اللَّهُ ذَلِكَ الْيَوْمَ " . ثُمَّ اتَّفَقُوا " حَتَّى يَبْعَثَ فِيهِ رَجُلاً مِنِّي " . أَوْ " مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يُوَاطِئُ اسْمُهُ اسْمِي وَاسْمُ أَبِيهِ اسْمَ أَبِي " . زَادَ فِي حَدِيثِ فِطْرٍ " يَمْلأُ الأَرْضَ قِسْطًا وَعَدْلاً كَمَا مُلِئَتْ ظُلْمًا وَجَوْرًا " . وَقَالَ فِي حَدِيثِ سُفْيَانَ " لاَ تَذْهَبُ أَوْ لاَ تَنْقَضِي الدُّنْيَا حَتَّى يَمْلِكَ الْعَرَبَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يُوَاطِئُ اسْمُهُ اسْمِي " . قَالَ أَبُو دَاوُدَ لَفْظُ عُمَرَ وَأَبِي بَكْرٍ بِمَعْنَى سُفْيَانَ .
আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি দুনিয়ার মাত্র একদিনও অবশিষ্ট থাকে তবে আল্লাহ সেই দিনকে অত্যন্ত দীর্ঘায়িত করবেন এবং আমার থেকে অথবা আমার পরিজন থেকে একজন লোক আবির্ভূত করবেন, যার নাম ও তার পিতার নাম আমার ও আমার পিতার নামের সঙ্গে হুবহু মিল হবে। সে পৃথিবীকে ইনসাফে পরিপূর্ণ করবে যেরূপ তা যুলুমে পরিপূর্ণ ছিলো। আর সুফিয়ান বর্ণিত হাদীসে বলেন, ততদিন দুনিয়া ধ্বংস হবে না, যতদিন পর্যন্ত আমার পরিবারের এক ব্যক্তি আরবে রাজত্ব না করবে, তার নাম হুবহু আমার নামই হবে।[1] হাসান সহীহ।
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَعْفَرٍ الرَّقِّيُّ، حَدَّثَنَا أَبُو الْمَلِيحِ الْحَسَنُ بْنُ عُمَرَ، عَنْ زِيَادِ بْنِ بَيَانٍ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ نُفَيْلٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " الْمَهْدِيُّ مِنْ عِتْرَتِي مِنْ وَلَدِ فَاطِمَةَ " . قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَعْفَرٍ وَسَمِعْتُ أَبَا الْمَلِيحِ يُثْنِي عَلَى عَلِيِّ بْنِ نُفَيْلٍ وَيَذْكُرُ مِنْهُ صَلاَحًا .
উম্মু সালামাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ মাহদী অমার পরিজন থেকে ফাতিমাহর সন্তানদের বংশ থেকে আবির্ভূত হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু জা‘ফার বলেন, আমি আবুল মালীহকে আলী ইবনু নুফাইলের প্রশংসা করতে এবং তার গুণাবলী বর্ণনা করতে শুনেছি।[1] সহীহ।
حَدَّثَنَا سَهْلُ بْنُ تَمَّامِ بْنِ بَزِيعٍ، حَدَّثَنَا عِمْرَانُ الْقَطَّانُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَبِي نَضْرَةَ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " الْمَهْدِيُّ مِنِّي أَجْلَى الْجَبْهَةِ أَقْنَى الأَنْفِ يَمْلأُ الأَرْضَ قِسْطًا وَعَدْلاً كَمَا مُلِئَتْ جَوْرًا وَظُلْمًا يَمْلِكُ سَبْعَ سِنِينَ " .
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার বংশ থেকে মাহদীর আবির্ভাব হবে, সে হবে প্রশস্ত ললাট ও উন্নত নাকবিশিষ্ট। তখনকার দুনিয়া যেরূপে যুলুমে ভরে যাবে, সে তার বিপরীতে তা ইনসাফে ভরে দিবে, আর সে সাত বছর রাজত্ব করবে।[1] হাসান।
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ الْحَفَرِيُّ، حَدَّثَنَا يَاسِينُ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ مُحَمَّدِ ابْنِ الْحَنَفِيَّةِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَلِيٍّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ " الْمَهْدِيُّ مِنَّا أَهْلَ الْبَيْتِ يُصْلِحُهُ اللَّهُ فِي لَيْلَةٍ " .
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মাহ্দী আমাদের আহলে বাইত থেকে হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে এক রাতে খিলাফতের যোগ্য করবেন।
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ - وَاللَّفْظُ لِقُتَيْبَةَ - قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ الآخَرَانِ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ رُفَيْعٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ ابْنِ الْقِبْطِيَّةِ، قَالَ دَخَلَ الْحَارِثُ بْنُ أَبِي رَبِيعَةَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ صَفْوَانَ وَأَنَا مَعَهُمَا، عَلَى أُمِّ سَلَمَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ فَسَأَلاَهَا عَنِ الْجَيْشِ الَّذِي يُخْسَفُ بِهِ وَكَانَ ذَلِكَ فِي أَيَّامِ ابْنِ الزُّبَيْرِ فَقَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " يَعُوذُ عَائِذٌ بِالْبَيْتِ فَيُبْعَثُ إِلَيْهِ بَعْثٌ فَإِذَا كَانُوا بِبَيْدَاءَ مِنَ الأَرْضِ خُسِفَ بِهِمْ " . فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَكَيْفَ بِمَنْ كَانَ كَارِهًا قَالَ " يُخْسَفُ بِهِ مَعَهُمْ وَلَكِنَّهُ يُبْعَثُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى نِيَّتِهِ " . وَقَالَ أَبُو جَعْفَرٍ هِيَ بَيْدَاءُ الْمَدِينَةِ .
কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ, আবু বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ..... উবাইদুল্লাহ ইবনু কিবতিয়্যাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হারিস ইবনু আবূ রাবী’আহ এবং ‘আবদুল্লাহ ইবনু সুফইয়ান (রহঃ) দু’জনেই উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামাহ্ (রাযিঃ) এর কাছে গেলেন। আমিও তাদের সঙ্গে ছিলাম। তারা তাকে ঐ বাহিনী সম্বন্ধে প্রশ্ন করলেন, যারা ভূমিতে ধ্বসে যাবে। তখন ইবনু যুবায়র (রাযিঃ) এর খিলাফতকাল ছিল। উত্তরে তিনি বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জনৈক আশ্রয় গ্রহণকারী বাইতুল্লাহ শরীফে আশ্রয় গ্রহণ করবে। তখন তার বিরুদ্ধে একটি বাহিনী প্রেরণ করা হবে। তারা যখন “বাইদা” নামক এক মাঠে অবস্থান নিবে তখন তারা ভূমিতে ধ্বসে যাবে। এ কথা শুনে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! ঐ লোকের ব্যাপারে এ কি করে প্রযোজ্য হতে পারে যে অসন্তুষ্ট হৃদয়ে এ অভিযানে শামিল হয়েছে? উত্তরে তিনি বললেন, তাদের সঙ্গে তাকে সহ ধ্বসিয়ে দেয়া হবে। তবে কিয়ামতের দিন তার উত্থান হবে স্বীয় নিয়াতের ভিত্তিতে। বর্ণনাকারী আবু জাফার (রহঃ) বলেন, এ "বাইদা" হলো মাদীনার নিকটবর্তী স্থান। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৯৭৬, ইসলামিক সেন্টার)
حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ شُجَاعٍ، وَهَارُونُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، وَحَجَّاجُ بْنُ الشَّاعِرِ، قَالُوا حَدَّثَنَا حَجَّاجٌ، - وَهُوَ ابْنُ مُحَمَّدٍ - عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو الزُّبَيْرِ، أَنَّهُ سَمِعَ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ، يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ - قَالَ - فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ صلى الله عليه وسلم فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ تَعَالَ صَلِّ لَنَا . فَيَقُولُ لاَ . إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ . تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الأُمَّةَ " .
ওয়ালীদ ইবনু শুজা', হারূন ইবনু আবদুল্লাহ ও হাজ্জাজ ইবনু শাইর (রহঃ) ..... জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একদল সত্য দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বাতিলের বিরুদ্ধে লড়তে থাকবে এবং অবশেষে ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন। মুসলিমদের আমীর বলবেন, আসুন সালাতে আমাদের ইমামাতি করুন! তিনি বলবেন না, আপনাদেরই একজন অন্যদের জন্য ইমাম নিযুক্ত হবেন। এ হলো আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত এ উম্মতের সম্মান। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯২ ইসলামিক সেন্টারঃ)
ভৌগোলিক মানচিত্র ও সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক স্থানসমূহ
মক্কা মুকাররমা (মসজিদুল হারাম)
রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝে অনিচ্ছাকৃত বায়আতের স্থানযেখানে আল্লাহভীরু মুমিনরা তাঁকে চিনে ফেলবেন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর হাতে আনুগত্যের বায়আত দেবেন।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗বায়দা প্রান্তর (মক্কা-মদিনার মধ্যবর্তী মরুভূমি)
শত্রুবাহিনীর ভূগর্ভস্থ ধসের (খাসফুল বায়দা) অলৌকিক স্থানযেখানে মাহদীকে হত্যা করতে আসা আগ্রাসী বাহিনীকে আল্লাহ তাআলা মরুভূমির বুকে ধসিয়ে দিয়ে অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশ করবেন।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗মদিনা মুনাওয়ারা
মাহদীর প্রাথমিক বাসস্থান যেখান থেকে তিনি মক্কায় যাবেনশাসকের মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধ শুরু হলে মাহদী মদিনা থেকে আত্মগোপন করতে মক্কায় চলে যাবেন।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗দামেস্ক (উমাইয়া মসজিদ / সাদা মিনার)
ফজরের নামাজের সময় হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথে মিলনের স্থানযেখানে দুই ফেরেশতার ডানায় ভর করে ঈসা (আ.) অবতীর্ণ হবেন এবং মাহদীর পেছনে নামাজ আদায় করবেন।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗বায়তুল মাকদিস (জেরুজালেম)
ন্যায়পরায়ণ খিলাফতের কেন্দ্রস্থলযেখান থেকে বৈশ্বিক জুলুমের অবসান ঘটিয়ে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗ইমাম মাহদী: ভাইরাল গুজব বনাম সহীহ সুন্নাহ
সোশ্যাল মিডিয়ায় যা ভাইরাল হয় বনাম সহীহ হাদীস ও ইতিহাসে যা প্রমাণিত।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইমাম মাহদীর কথা নেই, তাই এটি একটি দুর্বল ধারণা।
কাবায় আশ্রয় গ্রহণ, বায়দা মরুভূমিতে সেনাবাহিনী ধসে যাওয়া (সহীহ মুসলিম ২৮৮২) এবং ঈসা (আ.) অবতরণের সময় মুমিনদের ইমামতি করার ঘটনা (সহীহ বুখারী ৩৪৪৯) বুখারী ও মুসলিমেই আছে। আর ২০ জনেরও বেশি সাহাবী থেকে অর্থগত মুতাওয়াতির সূত্রে তাঁর উপাধি প্রমাণিত।
স্বপ্ন, সংখ্যাতত্ত্ব বা অনলাইনের ঘোষণার মাধ্যমে আজই ইমাম মাহদীকে চেনা সম্ভব।
আসল মাহদী কখনোই নিজের প্রচার করবেন না। মক্কায় রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝখানে তাঁকে বাধ্য হয়ে বাইয়াত নিতে হবে এবং তাঁর অকাট্য নিদর্শন হলো বায়দা মরুভূমিতে আক্রমণকারী সেনাবাহিনী মাটির নিচে ধসে যাওয়া (সহীহ মুসলিম ২৮৮২)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা ও সরাসরি উত্তর
তরুণদের সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও সহীহ দলীলভিত্তিক সংক্ষিপ্ত উত্তর
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে কি ইমাম মাহদীর নাম সরাসরি উল্লেখ আছে?
সরাসরি 'মাহদী' শব্দটি বুখারী ও মুসলিমে না থাকলেও তাঁর সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড যেমন কাবা প্রাঙ্গণে আশ্রয় নেওয়া, তাঁর বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনাবাহিনীকে বায়দা মরুভূমিতে মাটির নিচে ধসিয়ে দেওয়া (সহীহ মুসলিম ২৮৮২) এবং ঈসা (আ.)-এর অবতরণের সময় মুমিনদের নামাজের ইমামতি করা (সহীহ বুখারী ৩৪৪৯) স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আর সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযীতে তাঁর নাম ও উপাধি সরাসরি প্রমাণিত।
ইমাম মাহদীর আসল নাম ও বংশপরিচয় কী হবে?
নবীজি ﷺ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে তাঁর নাম হবে নবীজির ﷺ নামের অনুরূপ (মুহাম্মদ বা আহমদ) এবং তাঁর পিতার নাম হবে নবীজির ﷺ পিতার নামের অনুরূপ (আব্দুল্লাহ)। অর্থাৎ তাঁর নাম হবে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ। তিনি নবীজির ﷺ প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর বড় ছেলে হাসান ইবনে আলী (রা.)-এর বংশধর হবেন (সুনানে আবু দাউদ ৪২৮২, ৪২৮৯)।
ইমাম মাহদী কি নিজে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা বা বাইয়াত ক্যাম্পেইন চালাবেন?
কখনোই না! এটিই আসল মাহদীকে চেনার সবচেয়ে বড় ফিল্টার। তিনি নেতৃত্বের ভয়ে মদিনা থেকে পালিয়ে মক্কায় আশ্রয় নেবেন। মক্কার মুমিন ও আলেমগণ তাঁকে চিনে ফেলে জোরপূর্বক কাবা ঘরের রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝখানে তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর হাতে বাইয়াত নেবেন (সুনানে আবু দাউদ ৪২৮৬)।
বিশ্ববাসী কীভাবে অকাট্যভাবে নিশ্চিত হবে যে তিনিই প্রতিশ্রুত মাহদী?
তাঁর বিরুদ্ধে শাম থেকে পাঠানো এক শক্তিশালী আক্রমণকারী সেনাবাহিনীকে মদিনা ও মক্কার মধ্যবর্তী 'আল-বায়দা' মরুভূমিতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ মাটির নিচে ধসিয়ে দেবেন (খাসফ)। কোনো মানুষের পক্ষে মরুভূমির মাটি ফাটিয়ে আস্ত এক বাহিনীকে ধসিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; এই অলৌকিক ঐশী প্রমাণ দেখেই বিশ্ববাসী নিশ্চিত হবে (সহীহ মুসলিম ২৮৮২)।
আহলে সুন্নাহর ইমাম মাহদী এবং শিয়াদের ১২তম ইমামের পার্থক্য কী?
আহলে সুন্নাহর বিশ্বাস অনুযায়ী ইমাম মাহদী শেষ জামানায় সাধারণ মানুষের মতোই জন্ম নেবেন, তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ এবং তিনি হাসান (রা.)-এর বংশধর। অন্যদিকে শিয়াদের দাবি তাদের মাহদী হলেন মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল-আসকারী (হুসাইন রা.-এর বংশধর), যিনি ২৬০ হিজরীতে ৫ বছর বয়সে ইরাকের সামাররার এক পাতাল সুড়ঙ্গে ঢুকে ১১৫০ বছর ধরে গায়েব রয়েছেন।
কোনো ভুল চোখে পড়েছে?
হাদিসের মানে অসঙ্গতি, দুর্বল অনুবাদ, তথ্যসূত্রের ঘাটতি বা কোনো ত্রুটি চোখে পড়েছে? আমাদের জানান। প্রতিটি রিপোর্ট আলেম ও গবেষক দল গুরুত্বের সাথে যাচাই করে থাকে।