পর্যালোচনা সংস্করণএটি আলেমদের পর্যালোচনাধীন একটি খসড়া সংস্করণ। এখনও চূড়ান্তভাবে প্রকাশের জন্য নয়।
আল ফিতান

আদ-দুখান (ধোঁয়া): কুরআনের সতর্কবাণী, সাহাবায়ে কেরামের তাহকীক ও শেষ জমানার মহানিদর্শন

মক্কার দুর্ভিক্ষ বনাম শেষ জমানার বৈশ্বিক মহাধোঁয়া: হযরত ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর গবেষণার প্রামাণ্য পর্যালোচনা ও মুহাদ্দিসগণের সমন্বয়।

উৎস ও পর্যালোচনা
প্রকাশনার তারিখ2026-10-28
পাঠের আনুমানিক সময়11 মিনিট
1

১. আল-কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা: 'সুস্পষ্ট ধোঁয়া যা মানুষকে ঢেকে ফেলবে'

পবিত্র কুরআনের সূরা আদ-দুখানে মহাজাগতিক এক অভূতপূর্ব সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে: 'অতএব আপনি সেই দিনের প্রতীক্ষা করুন, যেদিন আকাশ সুস্পষ্ট ধোঁয়ায় ছেয়ে যাবে; যা সমগ্র মানবজাতিকে পরিবেষ্টন করবে। এটি এক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি!' (৪৪:১০-১১)।

আরবী ভাষায় দুখানিন মুবীন (دخان مبين) শব্দের অর্থ হলো এমন এক প্রকাশ্য ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তব ধোঁয়া—যার অস্তিত্ব নিয়ে কোনো মানুষের মনে কোনো সংশয় বা দ্বিধা থাকবে না। সাহাবায়ে কেরামের সোনালী যুগ থেকেই এই আয়াতের তাফসীর নিয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর গবেষণার সূত্রপাত হয়: এই ধোঁয়া কি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই মক্কার কাফিরদের ওপর দুর্ভিক্ষ হিসেবে ঘটে গেছে, নাকি এটি শেষ জমানার কিয়ামতের অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক আলামত?

2

২. সাহাবায়ে কেরামের দুই প্রামাণ্য দৃষ্টিভঙ্গি: ইবনে মাসউদ বনাম ইবনে আব্বাস (রা.)

সাহাবায়ে কেরামের মাঝে এই বিষয়ে দুটি প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী মতামত বিদ্যমান ছিল:

প্রথম মত — হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.):
সহীহ বুখারী (১০০৭) ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী ইবনে মাসউদ (রা.) মনে করতেন যে, এই ধোঁয়ার ঘটনা অতীতে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই ঘটে গেছে। কুরাইশরা যখন ইসলামের দাওয়াত চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করে, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের বিরুদ্ধে ইউসুফ (আ.)-এর যুগের মতো দুর্ভিক্ষের জন্য বদদোয়া করেন। সেই ভয়াবহ অনাহারে মানুষ এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আকাশের দিকে তাকালে তাদের চোখের সামনে ধোঁয়ার মতো অন্ধকার কুয়াশা ঘুরপাক খেত।

দ্বিতীয় মত — হযরত আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবু হুরায়রা ও ইবনে উমর (রা.):
অপরপক্ষে কুরআন ব্যাখ্যাকারীদের শিরোমণি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আমীরুল মুমিনীন আলী (রা.), আবু হুরায়রা (রা.) এবং তাবেয়ীগণের জমহুর দল দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেছেন যে, এই ধোঁয়া অতীতে কখনোই ঘটেনি; বরং এটি কিয়ামতের পূর্বে সশরীরে প্রকাশ পাবে।

হাফিয ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন, এক ব্যক্তি এসে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলল: 'আজ সকালে লেজযুক্ত এক ধূমকেতু উঠেছে, আমার ভয় হচ্ছে দুখান বোধহয় চলে এলো।' ইবনে আব্বাস (রা.) উঠে বসে বললেন: 'না, দুখান এখনও আসেনি! দুখান যখন আসবে তখন তা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীকে চল্লিশ দিন ধরে ঢেকে ফেলবে।' হযরত আলী (রা.) বলেন: 'দুখানের আয়াত এখনও বাস্তবায়িত হয়নি; এটি যখন আসবে তখন মুমিনদের কেবল সামান্য সর্দির মতো স্পর্শ করবে, আর কাফিরদের মাথা ফুলে প্রতিটি ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া বের হবে।'

3

৩. মুহাদ্দিসগণের সমন্বয়: হাফিয ইবনে কাসীর ও ইমাম কুরতুবীর ফয়সালা

দুই মহান সাহাবীর এই আপাত মতবিরোধের সমাধান কীভাবে করেছেন আমাদের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণ? হাফিয ইবনে কাসীর তাঁর কালজয়ী তাফসীরে এবং ইমাম কুরতুবী তাঁর আত-তাযকিরাহ গ্রন্থে অত্যন্ত চমৎকার ও সুস্পষ্ট সমাধান দিয়েছেন:

১. হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) মক্কার দুর্ভিক্ষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং কুরাইশদের সেই অনাহারের দৃষ্টিবিভ্রম একটি ঐতিহাসিক সত্য ছিল—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
২. কিন্তু তা কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতা নয়। কারণ সহীহ মুসলিমের ২৯০১ নম্বর হাদীসে হুজাইফা ইবনুল উসাইদ (রা.) পরিষ্কার বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কিয়ামতের যে দশটি প্রধান মহানিদর্শন (আশরাত আস-সাআ আল-কুবরা)-এর কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে দাজ্জাল, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ ও পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের পাশাপাশি 'আদ-দুখান'কে স্বতন্ত্রভাবে গণনা করেছেন। কিয়ামতের এত বড় এক মহাজাগতিক আলামত কখনোই মক্কার একটি সাময়িক দুর্ভিক্ষে সীমাবদ্ধ হতে পারে না।

অতএব আহলুস সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো: মক্কার ঘটনাটি ছিল এই শাস্তির একটি প্রাথমিক স্থানীয় নমুনা; কিন্তু কিয়ামতের সন্নিকটে অবশ্যই একটি বাস্তব, সুবিশাল ও বৈশ্বিক ধোঁয়া আবির্ভূত হবে যা সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করবে।

4

৪. মানবদেহে ধোঁয়ার প্রভাব: মুমিনের জন্য সাধারণ সর্দি, কাফিরের জন্য নিদারুণ যন্ত্রণা

হাদীসে বর্ণিত রেওয়ায়েতসমূহ থেকে জানা যায় যে, এই ধোঁয়াটি কোনো সাধারণ বিষাক্ত গ্যাস হবে না; বরং এটি মহান আল্লাহর কুদরতে মানুষের ঈমান ও আমল অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলবে:

  • মুমিনের ক্ষেত্রে: মুমিনদের ওপর এই ধোঁয়ার প্রভাব হবে অত্যন্ত মৃদু। এটি তাদের শরীরে ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ সর্দি-কাশির মতো (কা-হায়আতিয যুকাম) হালকা প্রভাব ফেলবে। এতে মুমিনের কোনো মারাত্মক ক্ষতি হবে না; বরং তা তাদের গুনাহ মাফের মাধ্যম হবে।
  • কাফির ও মুনাফিকদের ক্ষেত্রে: কাফির ও পাপাচারীদের ক্ষেত্রে এই ধোঁয়া ফুসফুস ও ইন্দ্রিয় ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করবে। তাদের শরীর ও মাথা ফুলে উঠবে, কান ও প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে ধোঁয়ার তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ বের হবে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে তারা আল্লাহর কাছে দু'আ করতে বাধ্য হবে: 'হে আমাদের রব! আমাদের থেকে এই আজাব দূর করে দিন, আমরা ঈমান আনব!'
5

৫. কিয়ামতের দশটি বড় আলামতের ধারাক্রমে দুখানের সঠিক অবস্থান

কিয়ামতের দশটি বড় নিদর্শনের মধ্যে আদ-দুখান ঠিক কোন মুহূর্তে ঘটবে? হাদীস বিশ্লেষকগণ উল্লেখ করেন যে, যেসব ক্ষেত্রে হাদীসে সরাসরি ক্রম উল্লেখ আছে (যেমন: দাজ্জালের পর ঈসা আ.-এর অবতরণ, এবং তাঁর জীবদ্দশায় ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন)—সেগুলো ব্যতীত অন্যান্য মহাজাগতিক নিদর্শনগুলোর ক্ষেত্রে কোনো একক হাদীসে বাধ্যবাধকতামূলক ক্রম দেওয়া হয়নি।

ইমাম কুরতুবী ও হাফিয ইবনে কাসীরের তাহকীক অনুযায়ী, আদ-দুখান আলামতটি কিয়ামতের শেষ পর্বের মহাজাগতিক পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। এটি সম্ভবত পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় এবং দাব্বাতুল আরদ (ভূগর্ভস্থ প্রাণী)-এর আত্মপ্রকাশের কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত হবে। পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠার পর তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। সেই সন্ধিক্ষণে আদ-দুখান সমগ্র মানবজাতিকে এক মহাজাগতিক ঝাঁকুনি দেবে, যা প্রমাণ করবে যে দুনিয়ার মোহময় জীবনের ইতি ঘটে মহাপ্রলয়ের দরজা উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

۞কুরআনুল কারীমের প্রাসঙ্গিক আয়াত

سُورَةُ · সূরা 44:10

۝10

বাংলা

English

سُورَةُ · সূরা 44:11

۝11

বাংলা

English

سُورَةُ · সূরা 44:12

۝12

বাংলা

English

📜প্রামাণ্য হাদীস শরীফ

#
বর্ণনাকারী: Hudhayfah ibn Usayd al-Ghifari (RA)

বাংলা

English

#
বর্ণনাকারী: Masruq from Abdullah ibn Mas'ud (RA)

বাংলা

English

#
বর্ণনাকারী: Abu Malik al-Ash'ari (RA)

বাংলা

English

⚖️

আদ-দুখান (ধোঁয়া) সংক্রান্ত প্রচলিত বিভ্রান্তি বনাম সুন্নাহর প্রামাণ্য তাহকীক

সোশ্যাল মিডিয়া ও লোকমুখে প্রচারিত দাবির বিপরীতে সহীহ সুন্নাহর প্রামাণ্য দলীলসমূহ।

❌ প্রচারিত দাবি #1

আদ-দুখান রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মক্কার দুর্ভিক্ষের সময়ই শেষ হয়ে গেছে, ভবিষ্যতে আর কোনো ধোঁয়া আসবে না।

✅ সহীহ সুন্নাহর বাস্তবতা

সহীহ মুসলিমের ২৯০১ নম্বর হাদীসে আদ-দুখানকে কিয়ামতের অন্যতম প্রধান বড় আলামত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জমহুর মুহাদ্দিসগণ প্রমাণ করেছেন যে শেষ জমানায় একটি বৈশ্বিক মহাধোঁয়া অবশ্যই দেখা দেবে।

❌ প্রচারিত দাবি #2

ধোঁয়া এসে সমস্ত মুসলমানদের দম বন্ধ করে তাৎক্ষণিকভাবে মেরে ফেলবে।

✅ সহীহ সুন্নাহর বাস্তবতা

সহীহ হাদীসের বক্তব্য হলো—ধোঁয়া মুমিনদের কোনো ক্ষতি করবে না, বরং কেবল হালকা সর্দি-কাশির মতো অনুভূতি দেবে। মুমিনদের প্রাণ কবজ করার জন্য শেষ সময়ে ভিন্ন একটি স্নিগ্ধ বাতাস আসবে।

❌ প্রচারিত দাবি #3

বর্তমান শহরের দূষিত ধোঁয়াশা বা কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধোঁয়াই হলো কুরআনে বর্ণিত আদ-দুখান।

✅ সহীহ সুন্নাহর বাস্তবতা

কুরআনে বর্ণিত আদ-দুখান আসমান থেকে আবির্ভূত হয়ে সমগ্র পৃথিবীকে একসাথে ৪০ দিন ঢেকে ফেলবে। সাধারণ কলকারখানার ধোঁয়া বা আঞ্চলিক বিস্ফোরণ এর সাথে তুলনীয় নয়।