93
বাংলা
English
হাতির মতো কান আর পাতালপুরীর রূপকথা বনাম ওহীর বাস্তবতা: সহীহ সুন্নাহ ও মুফাসসিরগণের তাহকীকের আলোকে ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ও ধ্বংসের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: ইয়াজুজ ও মাজুজ কোনো কাল্পনিক দানব বা ভিনগ্রহের প্রাণী নয়, বরং তারা আমাদের মতোই আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম)-এর রক্ত-মাংসের বংশধর।
হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ফাতহুল বারী (৬/৩৮২)-তে এবং হাফিয ইবনে কাসীর আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া (২/১১১)-তে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছেন যে, মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.)-এর তিন পুত্র (সাম, হাম ও ইয়াফিস)-এর মধ্যে ইয়াফিসের বংশ থেকেই এই জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি।
জনশ্রুতিতে প্রচলিত দাবি—যেমন আদম (আ.)-এর অনিচ্ছাকৃত স্খলন থেকে মাটির সংমিশ্রণে তাদের জন্ম, কিংবা তারা দেখতে এমন বিচিত্র জীব যার কান হাতির মতো—এগুলো পুরোপুরি ভিত্তিহীন ইসরাঈলী রেওয়ায়েত। ইমাম নববী শারহু সহীহ মুসলিম-এ বলেন: 'তারা বনী আদমেরই অন্তর্ভুক্ত। তাদের হাত, পা, চোখ এবং শারীরিক গঠন মানুষের মতোই। তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের অপরিমেয় সংখ্যাধিক্য, সীমাহীন রক্তলোলুপ বর্বরতা এবং এমন ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা যা কোনো পার্থিব সৈন্যবাহিনী প্রতিহত করতে পারবে না।'
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহফে (১৮:৯৩-৯৮) ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ জুলকারনাইনের এই অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। পূর্ব বা উত্তর প্রান্তের দুই সুউচ্চ পর্বতের মধ্যবর্তী উপত্যকায় পৌঁছে তিনি এক অসহায় জাতির মুখোমুখি হন, যারা ইয়াজুজ-মাজুজের চরম জুলুম ও রক্তপাতে বিপর্যস্ত ছিল।
তারা জুলকারনাইনকে কর দিয়ে একটি প্রাচীর বানিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি পার্থিব সম্পদ প্রত্যাখ্যান করে বলেন: 'আমার রব আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তাই উৎকৃষ্ট। তোমরা আমাকে শারীরিক শ্রম দিয়ে সাহায্য করো।' তিনি দুই পর্বতের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান বিশাল লোহার খণ্ড (যবুর আল-হাদীদ) দিয়ে ভরাট করান। এরপর বিশাল হাপর দিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে লোহাকে লাল টকটকে করেন এবং তার ওপর গলিত তামা (ক্বিত্বর্) ঢেলে দেন।
লোহা ও তামার এই সংমিশ্রণ এমন এক অভেদ্য, মসৃণ ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর সৃষ্টি করেছিল যার ওপর চড়াও সম্ভব ছিল না, আবার তা ছিদ্র করাও অসম্ভব ছিল। প্রাচীর নির্মাণের পর জুলকারনাইন কোনো অহংকার করেননি; বরং তিনি ঘোষণা করেছিলেন: 'এটি আমার রবের এক বিশেষ অনুগ্রহ। কিন্তু যখন আমার রবের প্রতিশ্রুত দিন (কিয়ামত) ঘনিয়ে আসবে, তখন তিনি একে মাটির সাথে মিশিয়ে ধূলিসাৎ করে দেবেন।'
সুনানে ইবনে মাজাহ (৪০৮০), তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদের সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্দার অন্তরালের এক বিস্ময়কর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রাচীরের ওপারে প্রতিদিন নিরলসভাবে মাটি ও লোহা খনন করতে থাকে।
সারাদিন খুঁড়তে খুঁড়তে যখন তারা প্রায় প্রাচীরের শেষ প্রান্তে পৌঁছায় এবং সূর্যের আলোর রেখা দেখতে পায়, তখন তাদের অহংকারী সর্দার বলে: 'আজ চলো, বাকিটুকু কাল সকালে এসে শেষ করব।' কিন্তু তারা মুখে 'ইনশাআল্লাহ' বলে না। ফলে রাতের বেলা মহান আল্লাহ প্রাচীরটিকে আগের চেয়েও বেশি শক্ত ও মজবুত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।
হাজার বছর ধরে প্রতিদিন এই চক্র চলছে। কিন্তু যখন তাদের বের হওয়ার মহাজাগতিক ক্ষণ সমাগত হবে, তখন আল্লাহর কুদরতেই তাদের সর্দারের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হবে: 'আজ চলো, কাল সকালে ইনশাআল্লাহ আমরা প্রাচীর ভেদ করে ফেলব!' এই একটিমাত্র বাক্যের বরকতে পরদিন এসে তারা দেখবে প্রাচীর ঠিক সেভাবেই ফাঁক হয়ে আছে, আর তারা সেখান থেকেই বন্যার ঢলের মতো পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে।
সহীহ মুসলিমের ২৯৩৭ নম্বর দীর্ঘ হাদীসে নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) এই মহাপ্রলয়ের ভৌগোলিক গতিপথ নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। বাবে লুদে হযরত ঈসা (আ.)-এর হাতে দাজ্জাল নিহত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে যখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, ঠিক তখনই হঠাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী আসবে:
'হে ঈসা! আমি আমার এমন এক বাহিনীকে মুক্ত করে দিয়েছি যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার ক্ষমতা কোনো মানুষের নেই। তুমি আমার মুমিন বান্দাদের নিয়ে অবিলম্বে তূর পাহাড়ের চুড়ায় আশ্রয় নাও!'
এরপর শুরু হবে ইয়াজুজ-মাজুজের সর্বগ্রাসী আগ্রাসন। প্রতিটি পর্বত ও উঁচু টিলা বেয়ে তারা বাঁধভাঙা বন্যার মতো নেমে আসবে। তাদের প্রথম দল যখন তাবারিয়া হ্রদ (Sea of Galilee)-এর পাশ দিয়ে যাবে, তখন তারা সেই বিশাল হ্রদের সমস্ত পানি ঢকঢক করে পান করে সম্পূর্ণ শুকিয়ে মরুভূমি বানিয়ে ফেলবে। পেছনের দল যখন আসবে, তখন শুষ্ক তলদেশ দেখে বলবে: 'মনে হচ্ছে এখানে একসময় পানি ছিল!'
তারা পৃথিবীতে যাকে পাবে তাকেই হত্যা করবে। এরপর অহংকারে উন্মত্ত হয়ে তারা আকাশের দিকে তীর ছুড়বে এবং বলবে: 'আমরা জমিনের সব মানুষকে খতম করেছি, এবার আসমানের অধিবাসীদের খতম করব!' আল্লাহ তাদের বিভ্রান্তিতে ফেলে পরীক্ষার জন্য সেই তীরগুলো রক্তরঞ্জিত করে জমিনে ফেরত পাঠাবেন।
তূর পর্বতের চূড়ায় হযরত ঈসা (আ.) এবং তাঁর সাথে থাকা মুমিনগণ ভয়াবহ খাদ্য সংকটে পড়বেন—এমনকি একটি ষাঁড়ের মাথার মূল্য একশো স্বর্ণমুদ্রার চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে হবে। এই চরম সংকটে হযরত ঈসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীগণ মহান আল্লাহর দরবারে আকুল ফরিয়াদ জানাবেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাদের ধ্বংসের জন্য কোনো বিশাল সৈন্যবাহিনী বা আসমানী বজ্রপাত পাঠাবেন না; বরং এক অতি ক্ষুদ্র জীবাণু প্রেরণ করবেন। হাদীসে একে বলা হয়েছে 'নাগাফ' (an-naghaf)—এটি এমন এক ধরণের পরজীবী কীট যা সাধারণত উট ও ভেড়ার নাকের ভেতরে জন্মায়।
এই কীট ইয়াজুজ ও মাজুজের কোটি কোটি মানুষের ঘাড়ে আক্রমণ করবে। এক রাতের ব্যবধানে পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী ও বর্বর বাহিনীটি এমনভাবে মারা পড়বে, 'যেমন কোনো একজন মাত্র মানুষ মারা যায়' (ফা মাওতু কা-মাওতি নাফসিন ওয়াহিদা)। সকালে হযরত ঈসা (আ.) ও মুমিনগণ পাহাড় থেকে নেমে এসে দেখবেন সারা পৃথিবী তাদের লাশে সয়লাব হয়ে গেছে এবং দুর্গন্ধে এক বিঘত জমিও ফাঁকা নেই।
আবারও হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর দরবারে দু'আ করবেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বুখতী উটের গলার মতো বিশাল বিশাল পাখি পাঠাবেন, যারা লাশগুলোকে তুলে নিয়ে সাগরে নিক্ষেপ করবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা পৃথিবীর সকল শহর-গ্রাম ধুয়ে-মুছে চকচকে আয়নার মতো পরিষ্কার করে দেবে।
বিগত দুই শতাব্দীতে কিছু সমসাময়িক লেখক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকারী ইয়াজুজ ও মাজুজকে রাশিয়ান বলশেভিক, চীনা জাতি কিংবা ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যের সাথে মিলিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।
হাফিয ইবনে কাসীর, আল্লামা আলূসী (রূহুল মা'আনী) এবং আধুনিক যুগের শায়খ ইবনে বায ও শায়খ উসাইমীন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের রূপক ব্যাখ্যা সুন্নাহর সরাসরি পরিপন্থী।
ইয়াজুজ-মাজুজের বের হওয়া কিয়ামতের দশটি 'বড় আলামত'-এর অন্যতম। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক উত্থান নয়, বরং এটি এমন এক বিশেষ মহাজাগতিক ঘটনা যা হযরত ঈসা (আ.)-এর আসমান থেকে অবতরণ এবং দাজ্জাল হত্যার পরেই কেবল ঘটবে। যারা দাবি করেন যে তাদের প্রাচীর বহু আগেই ভেঙে গেছে এবং তারা এখন সারা বিশ্ব শাসন করছে—তাদের এই বক্তব্য সহীহ মুসলিমের নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.)-এর অকাট্য হাদীস এবং কিয়ামতের বিশুদ্ধ ধারাক্রমের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
93
বাংলা
English
94
বাংলা
English
98
বাংলা
English
96
বাংলা
English
কাস্পিয়ান ও কৃষ্ণ সাগরের মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক গিরিপথ, যাকে প্রাচীন ভূগোলবিদগণ জুলকারনাইনের ঐতিহাসিক প্রাচীরের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗হাদীসে বর্ণিত সেই হ্রদ, যার সমস্ত পানি ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রথম দলটি পান করে সম্পূর্ণ শুকিয়ে ফেলবে।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗আল্লাহর নির্দেশে হযরত ঈসা (আ.) ও মুমিনদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখুন ↗সোশ্যাল মিডিয়া ও লোকমুখে প্রচারিত দাবির বিপরীতে সহীহ সুন্নাহর প্রামাণ্য দলীলসমূহ।
ইয়াজুজ ও মাজুজ হলো মাটির নিচের দানব বা এমন অদ্ভুত জীব যাদের কান এত বড় যে এক কান বিছিয়ে আরেক কান গায়ে দিয়ে ঘুমায়।
এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ইসরাঈলী রূপকথা। সহীহ হাদীসের অকাট্য প্রমাণ অনুযায়ী তারা হযরত নূহ (আ.)-এর পুত্র ইয়াফিসের বংশধর খাঁটি রক্ত-মাংসের মানুষ।
জুলকারনাইনের প্রাচীর বহু আগেই ভেঙে গেছে এবং বর্তমানের কোনো পারমাণবিক পরাশক্তিই হলো ইয়াজুজ-মাজুজ।
সহীহ মুসলিমের ২৯৩৭ নম্বর হাদীসে পরিষ্কার বর্ণিত হয়েছে যে, ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ঘটবে হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ ও দাজ্জাল নিধনের পর।
মানুষের সামরিক বাহিনী বা পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করে ইয়াজুজ-মাজুজকে পরাজিত করা সম্ভব হবে।
আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ.)-কে স্পষ্ট জানিয়ে দেবেন যে, এদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারও নেই। আল্লাহ তা'আলা অলৌকিকভাবে 'নাগাফ' নামক ক্ষুদ্র পরজীবী কীট দিয়ে তাদের এক রাতে ধ্বংস করবেন।
তাবারিয়া হ্রদ ইয়াজুজ-মাজুজ খেয়ে ফেলার কারণে এখনই শুকিয়ে গেছে।
তাবারিয়া হ্রদ আজও বিশাল জলরাশি ধারণ করে আছে। হাদীসে বর্ণিত শুষ্কতার ঘটনাটি শেষ জমানার সেই আগ্রাসনের সময় সশরীরে ঘটবে।